সাহিত্যে ডায়লগিং বা সংলাপ এর গুরুত্ব অপরিসীম।
আমরা যখন কথা বলি তখন সেটা সরাসরি যোগাযোগের একটি অংশ। কিন্তু কোন কথা না বলেও অন্য ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব। এটা তখন সামাজিক বিশ্বাস, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং অনুভূতির পর্যায়ে থাকে। কিন্তু ব্যক্তিগত উষ্ণ অনুভবের জন্য কথাবার্তার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। সাহিত্যে এটাকে ডায়লগ বা সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির যে কথোপকথন সেটাই সংলাপের আকারের লিপিবদ্ধ হয় সাহিত্যের পাতায় গল্প উপন্যাসে।
ডায়ালগিং বা সংলাপের ভূমিকা উপন্যাসে অনেক বেশি থাকে। কারণ উপন্যাস বিশাল একটি পটভূমি নিয়ে রচিত হয় যেখানে নানা ধরনের চরিত্র বিদ্যমান এবং এসব চরিত্রের নায়ক নায়িকারা পরস্পরের সাথে কথাবার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে সংলাপ থাকবেই। কিন্তু সংলাপ রচনা খুবই জটিল একটি আর্ট।
ভালোভাবে সংলাপ রচনা করার জন্য পরিবেশ এবং পরিস্থিতির প্রভাব অনেকখানি। ঐতিহাসিক পটভূমিকার গুরুত্বও রয়েছে। লেখক প্রথমে এই বিষয়গুলির উপরে শুরুতে যখনই আলোকপাত করেন তখন থেকে পাঠকের মাথার ভিতরে কেবল বিষয়গুলি পরিষ্কার হতে থাকে। একবার যখন পটভূমি টাকে পাঠকের কাছে পরিষ্কার করে বিধৃত করতে সফলভাবে সক্ষম হবেন লেখক, কেবলমাত্র তখনই পাত্র পাত্রীর সংলাপ দ্বারা বাস্তব উপলব্ধির কঠিনতম ব্যাপারটিকে সামনে নিয়ে আসার শৈল্পীক কাজ ওই সংলাপগুলি শুরু করতে পারেন তিনি। কাহিনীকারের দক্ষ ভাষায় যে কোন উপাখ্যানের বর্ণনা দিতে হলে প্রথমেই দরকার পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে পাত্র-পাত্রী অবস্থানকে একই প্ল্যাটফর্মে সুস্পষ্ট করা। একটি বা একাধিক সেটিংও তৈরী করার প্রয়োজন হয় এবং এটা করতে লেখক তার অভিজ্ঞতা ও ভাষাগত দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। এ দুটি অবস্থানের সাথে ওতপ্রোতভাবে একটি সম্পর্ক থাকে সেটাকে ঘটনার বর্ণনা দ্বারা আরো ভালোভাবে বোঝাতে হলে ঘটনাগুলিকে প্রথমেই সংলাপের দ্বারা লিপিবদ্ধ করা যায়। কিন্তু পাত্রপাত্রীর ডায়ালগের মাধ্যমে সেটিং তৈরী করা এটা ছোটগল্পের জন্য উপযোগী হতে পারে।কিন্তু একটি বিশাল উপন্যাসের পটভূমি Background তৈরী করতে লেখক প্রথমে পরিবেশ পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমিকাকে নিজস্ব বর্ণিল ভাষায় prelude ব্যাক্ত করেন। তারপর গল্পের প্রয়োজনে সেখানে পাত্র-পাত্রীদের আগমন ঘটে অনেকটা অবধারিত ভাবে। লেখক তাদের মাধ্যমে ছোট ছোট সংলাপের ভিতর দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব পাঠকের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু সবসময়ই লেখক তার মেসেজটি সংলাপের মাধ্যমে তুলে আনেন না। ছোট গল্পের মধ্যে সংলাপে মেসেজ থাকতে পারে কিন্তু উপন্যাসে লেখক কখনোই সংলাপের মাধ্যমে তাঁর মেসেজটি দেন না। কারণ এতে করে উপন্যাসের ভাব গাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে যাবে।
সংলাপের মাধ্যমে লেখক আসলে সংসারের মধ্যে পারস্পরিক টানা পড়েন, দ্বন্দ্ব সংঘাত, আশা ভরসার দোদুল্যমানতা, ইচ্ছা অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, আনন্দ, সুখ-দুঃখের অনুভূতি, প্রেম ভালোবাসার অভিব্যক্তি, লোভ লালসা, হিংসা বিদ্বেষের বর্ণীল রূপ, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, নিত্যদিনের বিবিধ অনুসঙ্গ জৈবিক তাগিদ সহ নানান প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি যত মানবীয় যাবতীয় বিষয়বলি রয়েছে সবকিছুই প্রকাশ করতে পারেন। একজন অভিজ্ঞ লেখকের চোখে মানুষের সকল অনুভূতিগুলি ধরা পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাকে সংলাপের মাধ্যমে তুলে আনা হচ্ছে অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং এজন্য মুন্সিয়ানার দরকার হয়।
পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সাথে পাত্র পাত্রীর সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য, উপযোগিতা, প্রয়োজন সংশ্লিষ্টতা এবং গুরুত্বপূর্ন সংযোগগুলি রক্ষা করে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সকল সময়ই যে উপন্যাস আধুনিক জীবনযাপন ভিত্তিক হবেই এমন নয়। কখনো কখনো গ্রাম ভিত্তিক উপন্যাস বা অতীতের কোন ঘটনার আলোকে আখ্যান তৈরি হয়। শহরে যেমন কংক্রিটের জঙ্গল থাকবে, থাকবে ব্যাস্ততা, অনেক বিড়ম্বনা, জটিলতা, গ্রামের মধ্যে তেমনি থাকবে পরিবেশ প্রকৃতির উদারতা,দারিদ্র, উদাসীনতা এবং জীবনযাত্রার সহজ সরলতা। এই দুইটি অবস্থান থেকে লেখক একটি বিশেষ সৃষ্টিশীল চোখের দৃষ্টি দ্বারা পাঠকের কাছে নিজস্ব সুবিধাজনক অবস্থানটি চিহ্নিত করে নিয়ে তাঁর ঘটনার বর্ণনা দিতে শুরু করেন।
প্রথম কাজটিই হল পটভূমি Background নির্ধারণ। প্রকৃতি, পরিবেশ এবং পরিস্থিতির উপযোগিতা সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় বর্ণনাটি সেরে ফেলা। এটাকে মুখবন্ধের মতই ক্রিয়াশীলতায় একটি আবহ সঙ্গীত বলা চলে। আবহের এই বর্ণনাতে একজন লেখক যত বেশী সমৃদ্ধ হতে পারবে ততই লেখক বিভিন্ন Angle প্রেক্ষিত হতে পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। উপন্যাসটির মাত্রা এবং কলেবর এতে বৃদ্ধি পেলেও তবু সেটা মানুষের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠতে বাধ্য। তারপর আসে মনন বা বিশ্লেষনী দৃষ্টিভঙ্গির সূক্ষ্মতা। এটাও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার কৌশল। এটা অনেক জনপ্রিয় লেখকদের প্রধানতম অস্ত্র। পাঠক যখন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা ছাড়াও পটভূমির সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অনায়াসে স্মরণে রাখতে পারবে তখনই ডায়ালগের সূচনা হবে এবং এভাবেই লেখক নিজেও বুঝতে পারবেন যে কখন কোন ডায়লগটি স্বাভাবিকভাবেই গল্পের প্রয়োজনে সামনে চলে আসে। তখন লেখক তার ভাষার দক্ষতা দিয়ে পাত্র পাত্রীর মুখ দিয়ে ডায়লগ গুলি পরিবেশন করবেন। এভাবে একজন লেখক যেমন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বর্ণনা দিতে পারবেন ঠিক সেভাবেই একজন ঋদ্ধ পাঠকও লেখকের মনোভাব গুলি বুঝতে পারবেন, অক্ষরে অক্ষরে অনুভব করতে পারবেন এবং লেখক জনপ্রিয় হতে পারবেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন